আবুল বাশার

বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোর


১৬ জুন ২০২৩ ০২:২১



ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি: ঝুঁকিতে কিশোরদের ভবিষ্যৎ

আবুল বাশার, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর

১৬ জুন ২০২৩ ০২:২১

ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি: ঝুঁকিতে কিশোরদের ভবিষ্যৎ

ছবি : সংগৃহীত

জাতিসংঘের শিশু তহবিল-ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে পর্নোসাইটগুলোতে যাওয়ার পরিমাণ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়ে ওঠায় নিজেদের অজান্তেই তারা এসব সাইটে ঢুকে পড়ে। সুযোগ থাকায় বয়ঃসন্ধিকালের অনেক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে গিয়েও অনেকে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে অনেকে অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হয় কিংবা যৌনতাকেন্দ্রিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ইউনিসেফ বলে আসছে, বাংলাদেশের শিশুরা অনলাইনে উৎপীড়ন ও হয়রানিসহ নানা ধরনের বিপদের হুমকির মধ্যে আছে। কয়েকটি গবেষণায় দেখে গেছে, দেশে দিন দিন শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌনতাকেন্দ্রিক অপরাধ বাড়ছে, যাতে বিপুলসংখ্যক শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এই অবস্থা থেকে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের রক্ষা করতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, প্রযুক্তির ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে। কিশোররা ইন্টারনেট সংযোগসহ মুঠোফোন ব্যবহার করছে। তারা যা দেখছে, বাস্তবে তা ঘটিয়ে বসছে। তার মতে, নিয়ম হওয়া উচিত ছিল, কিশোররা ইন্টারনেট সংযোগ নেই এমন বেসিক ফোন ব্যবহার করবে এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ই-মেইল আইডি ও পাসওয়ার্ড অভিভাবকরা জানবেন। কিন্তু বাস্তবে সেটি হচ্ছে না।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে যৌনতাকেন্দ্রিক অপরাধের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আর এ অপরাধের সঙ্গে শিশু-কিশোর ও তরুণদের যুক্ত হওয়ার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এমন কি যৌনতাকেন্দ্রিক এসব অপরাধ ও অপরাধীর বয়সও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বছরগুলোতে শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং তরুণরা যৌনতাকেন্দ্রিক যেসব অপরাধে জড়িয়েছে তার উদাহরণ অহরহ রয়েছে। যেমন, ২০২১ সালে রাজধানীর কলাবাগানে ও-লেভেলের এক ছাত্রীর সহপাঠী ছেলেবন্ধুর সঙ্গে শারীরিক মিলনে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়। কলাবাগানের এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা ওই ঘটনাটিকে কিশোর-কিশোরীদের অস্বাভাবিক যৌনাচরণ বা টিন অ্যাবনর্মাল সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার বলে জানান।

জানা গেছে, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, অশ্লীল মন্তব্য, যৌন ক্রিয়ার ধরন, মেয়ে সহপাঠীকে পর্নো নায়িকার মতো ব্যবহার করার ইচ্ছা এসবই ঘটছে শিশু-কিশোর-কিশোরীদের অস্বাভাবিক যৌনাচরণের কারণে। ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি ছাড়াও অসৎ সঙ্গ, অপরাধী চক্র, পর্নোবিষয়ক চটি বই ইত্যাদির মাধ্যমেও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অস্বাভাবিক যৌনাচার প্রবণতা গড়ে উঠছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, অনেকের ধারণা, যৌনতা একটি পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তেমনটা নয়। হাইপার সেক্সুয়ালিটি বা কম্পালসিভ সেক্সুয়াল ডিসঅর্ডার সমস্যার লক্ষণ শিশুদের ১০ বছর বয়স থেকেই দেখা যেতে পারে। এটা একটা সময় কিশোর-কিশোরীদের যৌবনের শুরু হতো গড়ে ১৬ বছর বয়সে। এখন সেটা নেমে এসেছে ১০ বছরে। এর মানে মানুষের যৌনচিন্তা ও শারীরিক প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে আগেভাগেই। লক্ষণগুলো হচ্ছে—যৌন বিষয়ে অতিরিক্ত উৎসাহ এবং পরিণত বয়সের আগে থেকেই যৌন চাহিদা তৈরি হওয়া। যৌনক্রিয়ায় কোনটি স্বাভাবিক আর কোনটি অস্বাভাবিক, এই বোধ ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে না কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। কারণ, সুস্থ যৌনক্রিয়া কী, সেই শিক্ষা পাওয়ার আগেই পর্নোগ্রাফি ও বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে তারা পেয়ে যাচ্ছে বেপরোয়া ও অস্বাভাবিক যৌনক্রিয়ার শিক্ষা।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকে হয়তো শুধু আনন্দের জন্য ইচ্ছা করে পর্নোগ্রাফি দেখেন, কিন্তু শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। তারা মুঠোফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিকস ডিভাইস ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ পর্নোগ্রাফি অ্যাপে ঢুকে পড়ে। এরপর সেই স্টোর থেকে অনবরত ভিডিও, ছবি, তথ্য আসতে শুরু করে সেই শিশু-কিশোরের কাছে। একবার যদি শিশুরা এই নিষিদ্ধ জিনিস দেখতে শুরু করে, তখন সেটা তাদের নেশা হয়ে যেতে সময় লাগে না।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) ও নারীর প্রতি সহিংসতা কর্মসূচির আওতায় বেসরকারি সংস্থা (ডিনেট) এক গবেষণায় বলছে, বাংলাদেশেও কিছু পর্নোগ্রাফি নির্মাণ করা হচ্ছে, যার মান আন্তর্জাতিক পর্নোগ্রাফির মানের চেয়ে আরও নিম্ন ও কুরুচিপূর্ণ। এগুলোও ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। যেখানে মেয়েদের দেখানো হচ্ছে মন্দ, অবমাননাকর, অশ্লীল, প্রতিশোধমূলক ও বিদ্বেষমূলকভাবে। ভার্চুয়াল যৌনতার উপাদান হিসেবে ও যৌন ব্যবসা প্রচারের উদ্দেশ্যেও মেয়েদের উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে কিশোররা নারীদের এভাবেই দেখছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এসব কনটেন্টের দর্শক হিসেবে শিশু, কিশোর-তরুণদের একটা বড় অংশ রয়েছে। আর এসব অনেক কনটেন্টে শিশু, কিশোর-কিশোরীদের অভিনয়/ব্যবহার করা হচ্ছে।

এমজেএফ ও ডিনেট আর বলছে, ২০১৭ সালে সরকার পর্নেোবিরোধী কর্মসূচি শুরু করার পর থেকে দেশে ২০ হাজারেরও বেশি পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ২০ হাজার ওয়েবসাইট নিষিদ্ধ করে পর্নোগ্রাফি দেখা ও প্রচার কতটা রোধ করা গেছে, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। কেননা, নতুন করে আরও অনেক পর্নো ওয়েবসাইট এখনো চলছে। এ ছাড়া অসংখ্য আনসেন্সরড কনটেন্টে সয়লাব হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমজেএফের সিনিয়র সমন্বয়ক শাহানা হুদা রঞ্জনা বলেন, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যখন এসব পেজ দেখতে শুরু করে, তখন সেখানকার চরিত্রগুলোকেই আদর্শ মনে করে এবং নিজেদের তাদের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করে। এভাবে তারা না জেনে, না বুঝে জড়িয়ে পড়ে ক্ষতিকর ও অস্বাভাবিক যৌন আচরণে। কিন্তু অভিভাবকদের বেশির ভাগেই জানেন না, এই জগতে কী ধরনের বিপদ ওত পেতে আছে। আর ইন্টারনেট ব্যবহারে সন্তানের চেয়ে দক্ষতায় পিছিয়ে আছেন অভিভাবকেরা। সেই সুযোগে সন্তানরা মা-বাবাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।  

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এমপ্লয়টেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি) ভয়াবহ তথ্য দিয়ে বলছে,  শিশুদের দিয়ে যৌনদৃশ্যে অভিনয় করানো, তাদের যৌন নিপীড়নের ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং এসব আদান-প্রদানের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন (সিক্যাফ) ‘বাংলাদেশ সাইবার অপরাধপ্রবণতা-২০২৩’-বিষয়ক প্রতিবেদনে বলেছে, সাইবার অপরাধের ধরন বদল দেখা দিয়েছে এবং বেশি ঝুঁকিতে আছেন নারী ও শিশুরা। সাইবার জগতে শিশু ভুক্তভোগীদের হার ক্রমেই বাড়ছে। সারা দেশে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠছে, যারা ফাঁদে ফেলে শিশু ও নারীদের নিয়ে ব্যবসা করছে।

গত মে মাসে সিআইডি অনলাইনভিত্তিক অ্যাপ টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্যদের কাছে যৌন ভিডিও বিক্রির অভিযোগে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। টেলিগ্রামে ‘পমপম’ নামের একটি গ্রুপ খুলে সদস্যরা নানাভাবে কিশোরী ও তরুণীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা হতো। এরপর কৌশলে তাদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে, তা বিদেশে বিক্রি করা হতো। সিআইডি বলছে, ভুক্তভোগী কিশোরী-তরুণীরা প্রতারকদের কোনো প্রস্তাবে সাড়া না দিলে তাদের নাম-পরিচয় ও আর ব্যক্তিগত তথ্য লাখ লাখ গ্রাহকের টেলিগ্রাম গ্রুপগুলোতে ভাইরাল করে দেওয়া হতো। এ ছাড়া সম্প্রতি ভারতের বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর জানা যায় অনলাইনভিত্তিক অ্যাপ টিকটক ব্যবহার করে প্রায় ৫০০ মেয়েকে বিভিন্ন দেশে পাচার করে একটি চক্র। এরপরই আলোচনায় আসে ইন্টারনেটভিত্তিক এই অ্যাপের মাধ্যমে অল্প বয়সী মেয়েদেরকে কীভাবে যৌন কাজের জন্য পাচার করা হয়।

এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ছেলেমেয়েরা যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়, তখন তাদের নিজের দেহ ও মন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকে। আর সেই প্রশ্নের সঠিক জবাব না পেলে বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে নানা রকম ক্ষতি হতে পারে। একজন শিশু যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়, তখন সেই শিশুর জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। আমাদের পরিবার ও সমাজ শিশুদের বয়ঃসন্ধিকাল, এই বয়সের সমস্যা, সাবধানতা, বিপদ, যৌন জীবন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আলোচনাকে গ্রহণ করে না, বরং এ-বিষয়ক আলোচনাকে ঘরে-বাইরে, এলাকায়, স্কুলে ঠেকানোর চেষ্টা করে থাকে। তাই শিশু-কিশোরদের যৌনতাকেন্দ্রিক অপরাধের পেছনে পরিবার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এটি কাটিয়ে উঠতে হলে সমাজের সব সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ ও সদিচ্ছা দরকার।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক সমাজে পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার গঠন এবং জীবনযাত্রা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়াটাও শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ না নেয়াও যৌনতাকেন্দ্রিক অপরাধপ্রবণতার বড় কারণগুলোর অন্যতম। এমন অবস্থায় পরিবারের পাশাপাশি, সামাজিক সব সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তারা।

এবি/এইচআই