আবুল বাশার, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
১৮ অক্টোবর ২০২২ ০১:১৩
প্রতীকী ছবি
মৌসুমী আক্তার (ছদ্মনাম);
বয়স ১৩ কি ১৪ বছর। দিনের বেলা রাজধানীর ধানমন্ডি লেক ও আশপাশের এলাকায় ভিক্ষা করেন।
যে কয়েক টাকা জোটে, তা দিয়েই পেট চলে। মা-বাবা বেঁচে আছে, কিন্তু খোঁজ নেই। মৌসুমির
রাতের ঠিকানাও ধানমন্ডি লেক। তবে রাতের জীবনটা তার কাছে বিভীষিকা।
বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোরের
কাছে রাতের জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে মৌসুমি বলেন, ৩ থেকে ৪ বছর আগের কথা। প্রথম প্রথম রিকশাচালকসহ কিছু বয়স্ক মানুষ তার
শরীরে হাত দিতেন। পরে এক রাতে তাকে ঘুম থেকে তুলে খাবার দিবে বলে ধানমন্ডি লেকের
নির্জন জায়গায় নিয়ে যৌন নিপীড়ন চালান এক ব্যক্তি। অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই ব্যক্তি তাকে
ওষুধও খাইয়ে দেয়। এভাবে চলে দিনের পর দিন। বিষয়টি কয়েকজনকে জানিয়েও সমাধান পাননি
মৌসুমী।
মৌসুমী জানান, পরবর্তী
সময়ে ভাসমান ছেলে থেকে শুরু করে ভিক্ষুক— সবার হাতেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন
তিনি। কেউ টাকার প্রলোভনে, কেউ খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে নির্যাতন চালিয়েছে। মৌসুমি
জানান, শুরুতে অসুস্থ হয়ে পড়তেন, মন খারাপ থাকত; এখন সয়ে গেছে।
রাজধানীর শাহবাগ এলাকায়ও
মৌসুমীর মতো অনেক ভাসমান শিশু রয়েছে। তাদের প্রায় সবার গল্প একই। এদের মধ্যে এক মানসিক
প্রতিবন্ধীর সঙ্গে কথা হয় বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোরের। তিনি জানান, অন্ধকার নামলে
খাবার দেওয়ার কথা বলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কসহ আশপাশের নির্জন জায়গায়
নিয়ে তার ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়।
বেসরকারি সংস্থা ‘উন্নয়ন
অন্বেষণের’ এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে পথশিশুর সংখ্যা ৪ লাখ। ভাসমান মেয়েশিশুরা
নিরাপত্তার অভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। চিকিৎসার অভাবে এক সময় এদের অনেকেই
অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন। অনেক সময় মারাও যান। যৌন নিপীড়নের শিকার এমন
শিশুদের ৪৫ শতাংশই কোনো না কোনো যৌনরোগে আক্রান্ত হন। তাদের অনেকেই কোনো ধরনের
চিকিৎসা সেবাও পান না।
রাজধানীর মিরপুর শাহআলী মাজার
এলাকায় ১৫-১৬ বছর বয়সের টুম্পা (ছদ্মনাম) বলেন, “বাবা-মা’রে চিনি না। মাজারে কবে
আইছি, কইতে পারুম না।” টুম্পা জানান, ৪ থেকে ৫ বছর আগ থেকেই মিরপুর-১ এর বিভিন্ন
জায়গায় তাকে যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নির্যাতনকারীর তালিকায় সব বয়সী
পুরুষই আছে। ভাসমান কিশোর গ্যাংয়ের ছেলেরা মাঝে মাঝে জোর করে নির্জন এলাকায় নিয়ে
নির্যাতন চালায়। অসুস্থ থাকলেও ছাড় মেলে না।
‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার
ফোরাম’ বলছে, যৌন নিপীড়নের শিকার শতকরা ৫ ভাগ ছেলেশিশু। মেয়ে শিশু শতকরা ৯৫ ভাগ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান
ব্যুরোর ২০১৪ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকায় ভাসমান মানুষের সংখ্যা ৫০ হাজার। এর মধ্যে
অর্ধেকই নারী। এসব নারীর বেশির ভাগই কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতন ও প্রতারণার
শিকার হচ্ছেন। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘শিশু
কংগ্রেসে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমূহ সব রকমের যৌন নিপীড়ন এবং যৌন নির্যাতন থেকে
শিশুদের রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকবে। নির্যাতন প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে অংশগ্রহণকারী
রাষ্ট্রসমূহ জাতীয়, দ্বি-পাক্ষিক সকল প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’ বাংলাদেশ ১৯৯০
সালের ৩ আগস্ট শিশু অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ সনদে (সিআরসি) স্বাক্ষর করে।
ভাসমান মেয়েদের উপর সংঘটিত
যৌন নিপীড়ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া
রহমান বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের খারাপ অবস্থা নিয়ে আলোচনা
করলে আমরা মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তকে নিয়ে কথা বলি। মধ্যবিত্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
বাবা-মায়ের দায়িত্ব, তাদের অন্যান্য অধিকার নিয়ে কথা বলি। কিন্তু ভাসমান বা সমাজের
নিচু শ্রেণিতে থাকা শিশু-কিশোরদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করি না। ভাসমান
শিশু-কিশোরদের ড্রাগ অ্যাডিকশন, যৌন নিপীড়নসহ তাদের কোনো সমস্যা নিয়েই আলোচনা করি না।
যারা ভাসমান ছেলে-মেয়ে, তারা কোনো অধিকারও পায় না। এমনকি তারা মা-বাবার ভালোবাসা
থেকেও বঞ্চিত।’
ড. জিয়া রহমান আরও বলেন, ‘মেয়েশিশুরা সমাজব্যবস্থার ফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত যৌন নিপীড়নের শিকার হন এবং ধীরে ধীরে
পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েন। সমাজ বা সরকারের অবহেলায় খুন, ছিনতাই-চুরিসহ
পতিতাবৃত্তি আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। কাজেই সরকারের পাশাপাশি যেসব এনজিও বা
প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের উচিত এই ভাসমান বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করা। আমাদের
সমাজব্যবস্থা এভাবে চলতে থাকলে উজ্জ্বল ছেলে-মেয়েদের একটা বড় অংশকে দেশ হেলায়
হারিয়ে ফেলবে।’
এবি/কেএ