পর্ব-১ , ভীরু জমাদার, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৭:৩৯
ছবি: সংগৃহীত
পাঠক শিরোনাম দেখে ঘাবড়ে গেলেন? ঘাবড়াবেন না। সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের এই সত্য প্রকাশ কোমায় আছে। এইযে দেশময় ভাঙচুর চলছে, এর অন্তত ১৫ দিন আগে থেকে চলছে হুমকি। সব শেষ হাসনাতের বক্তব্য ছিল " শেখ হাসিনার বক্তব্য যারা প্রচার করবে তারা গণশত্রু বিবেচিত হবে" এর আগে কখনও হাত কখনও কলম ভেঙে দেয়ার ঘোষণা এসেছে। আসিফও প্রায়ই হুমকি দেয়। এসব হুমকির কারণ বোঝা গেলো ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙার পর থেকে। যাই হোক আপাত দৃষ্টিতে তারা সফল। টানা হুমকিতে কাজ হয়েছে। গণমাধ্যমগুলো শুধু খবরটা দিয়েছে। নূন্যতম সমালোচনা করতে পারেনি। আক্ষরিক অর্থে তারা কোমায় চলে গেছে।
আসলেই ৭
হাজারের বেশি সাংবাদিক আছেন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আসলেই তারা মৃত, কিন্তু মৃত নয়।
কখন কার কাজ থাকবে না তা কেউ নিশ্চিত নয়। কে কখন চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হবেন নিশ্চিত
নয়। কখন যে কার আত্মহত্যা করার মত পরিস্থিতিতে পড়বে তাও জানেন না। তাই সবাই এখন নিশ্চুপ
রাজার প্রজা। কোন সত্যই প্রকাশ করতে পারছেন না। চুপ থেকে বঞ্চনার গল্প শেষ হলেও এক
রকম ভালো হতো। কিন্তু এখানে চুপ থেকেও মানষিক নির্যাতন শেষ হচ্ছে না। তাদের অভিনয়ও
করতে হচ্ছে ভালো থাকার। কারণ উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে যখন বলা হচ্ছে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা
এখন আগের চেয়ে বেশি স্বাধীন, তখন মুখে স্মিত হাসি ঝুলিয়ে বলতে হচ্ছে ঠিক ঠিক। বাঁচতে
তো হবে। পরিবার আছে সন্তান আছে, সবার হাত পা তো মুখ তো বাঁধা সেখানেই।
ক'দিন আগে
ঢাকার ঢাকার উচ্চ আদালতে আলাদাভাবে আনা হয়েছিল সাংবাদিক দম্পতি শাকিল-রূপাকে। এক আদালত
জামিন দিলেও আরেক আদালত তা আটকে দেয়। সেটাও খুব বেশি আলোচিত হয়নি। কিন্তু এই দম্পত্তি
যখন মুখোমুখি হয় একে অপরের তখন এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি চয় গোটা আদালত চত্বরে।
কারণ কারাগারে তাদের ওপর চালানো অত্যাচার নিয়ে নানা কথা ভাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এটা সবাই জানে। কিন্তু এর সত্যতা যাচাই করতে পারে না। তবু দূর থেকে দেখে বোঝা যায় এসব
অত্যাচারের তথ্য কিছুটা হলেও বটে। তাদের একমাত্র সন্তান ৬ মাসের বেশি বাবা-মা ছাড়া।
জন্মের পর প্রায় ১৮ বছর যে মেয়ে বাবা মায়ের কোল ছাড়া হয়নি সেই মেয়েটি আজ আশ্রিত। এটাও
সবাই ভাবে৷ গুঞ্জন ওঠে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারে না।
একাত্তর
টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার চিকিৎসা হচ্ছে
না। প্রেসক্লাবের সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তের পরিবারও রাস্তায় এ
দুয়ার থেকে ও দুয়ারে ছুটে বেড়াচ্ছে তার মুক্তির আশায়। তার পত্রিকাটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রথম শ্রেণির
পত্রিকা যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। খুব কাছাকাছি সময়ে
সময় টেলি়ভিশন থেকে ৫ সাংবাদিকের চাকুরিচ্যুতির গল্পটি নিশ্চয়ই সবাই জানেন। এগুলো নানা
ভাবে মানুষের কাছে এসেছে বলে সবাই জানে। কিন্তু মানুষ জানে না, এরকম হাজারো গল্প জমেছে
গত ছয় মাসে।
ঢাকার সাংবাদিকরা আজকাল কোন কিছুতে চমকায় না। কারো চাকরি
গেলে ভাবে যাক আমারটা তো যায়নি। কেউ প্রতিবাদ করে না। কারণ কে সেধে হত্যা মামলার আসামী
হবে? কিম্বা আততায়ীর হাতে কে খুন হবে?
প্রায় প্রতিদিনই
ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, খুন, জখম অথবা বাড়িতে হামলার তথ্য আসছে। অন্তত পাঁচজন
সাংবাদিকের আত্মহত্যার তথ্য জমেছে গত ছয় মাসের ইতিহাসে। বহু সিনিয়র সাংবাদিক আছেন যারা
নিয়মিত কথা বলে কাজ করে লিখে অভ্যস্ত, তারা অনেকেই বাসা থেকে বের হন না। ঘরের মধ্যে
সিটিঁয়ে আছেন। অনেকের নামে মামলা হয়েছে। এটা যে শুধু ঢাকায় তা নয় ঢাকার বাইরেও একই
অবস্থা। বরিশালে কাজ করেন এমন সাংবাদিকের নামে মামলা হয়েছে ঢাকার হাতির ঝিলে হত্যার
অভিযোগে। কোথাও কোন যুক্তির চর্চা নেই। কেন এরকম হলো একথা জিজ্ঞেস করারও কেউ নেই।
সব মিলিয়ে
গোটা বাংলাদেশ এখন নরককুণ্ড সাংবাদিকদের জন্যে। চাকরির ভয়, অপদস্ত হওয়ার ভয়, মামলার
ভয়, প্রাণের ভয়ে ঘিরে আছে বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাংবাদিক। পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন আমি সব সাংবাদিক না বলে
বেশিরভাগ সাংবাদিক বলেছি। কারণ সাংবাদিকদের একটি ক্ষুদ্র অংশ আজকে বাংলাদেশে যারা ক্ষমতাশীন
তাদের দিয়েই কাজটা করাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কারা এই সাংবাদিক? এরা কী শুধুই সাবেক সরকার বিরোধী? সাবেক সরকারের
সময় নির্যাতিত হয়ে এখন প্রতিশোধ নিচ্ছেন? খুব সরল ব্যখ্যায় হয়তো হ্যাঁ বলে দেয়া যায়।
কিন্তু বিষয়টি মোটেও এত সরল নয়। এই ব্যাখ্যা দিতে হলে রীতিমতো লম্বা পর্যবেক্ষণ লাগবে।
পাঠক এই
লেখা আমি ছোট করতে চাই। যে কারণে অত বিশদ আলোচনায় যাবো না। কিন্তু গত ২০/ ২৫ বছর বাংলাদেশের
সাংবাদিকতায় আছেন এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা যে ব্যখ্যা দেন তাতে বাংলাদেশের
সাংবাদিকদের ওপর কেন এই বিদ্বেষ এনিয়ে একটা বই লেখা দরকার। এখন পাঠক আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন, আমার কেন সাংবাদিক
নির্যাতন এবং এর ভেতরে বাহির নিয়ে লেখার দায় পড়লো। কারণ আর কিছু নয়।
যখন দেখলাম জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন এমন বহু সাংবাদিক যখন হত্যা মামলার আসামী।
ফেসবুক প্রফাইল লাল করে ঘুরে বেড়িয়েছেন এমন বহু সাংবাদিককে বলা হচ্ছে স্বৈরাচারের দোসর।
তখন কারণ না খুঁজে উপায় কী?
লেখার এই
পর্যায়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বিকাশের পরম্পরা বলা দরকার। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযুদ্ধের
পক্ষের এক দল মানুষের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা। সেখানে
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দ্বিমত ছিল এমন মানুষদের একটা ক্ষীণ ধারা যে ছিল না তা বলছি না। ছিল
কিন্তু তারা কোনদিন সামনে আসতে পারেনি। এমনকী ৭৫ এর ১৫ই আগস্টের পরেও তারা খুব একটা
সামনে আসতে পারেনি। দীর্ঘ সময় সামনে থেকে প্রগতিশীল দর্শনের অনুসারীরাই গণমাধ্যমের
নেতৃত্ব দিয়েছে। অনেক লড়াই গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের
সাংবাদিকতার মূল স্রোতধারা কখনও জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ায়নি।
১৯৯৬ সালে
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রগতিশীল ধারা নতুন গতি পায়। এখানে বলে রাখা ভালো
এই যে প্রগতিশীল ধারার কথা বলছি, এরা কিন্তু কেউ সরসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হননি।
হাতে গোনা যারা হয়েছে তাদের সংখ্যা এত কম যে, উদাহরণ হিসাবেও আসে না। এর মধে বিএনপি
আরেকদফা ক্ষমতায় এসেছে। ওয়ান ইলেভেন এসেছে।
সাংবাদিক কিন্ত তার চরিত্রে থেকে কাজ করে গেছে। তারা সব সময় প্রগতির পক্ষেই
থেকেছে। মূল ধারা সব সময় সাদাকে সাদা আর কালোকে কালোই বলেছে। ওয়ান ইলেভেনের সময় ঠাট্টা
করে সবাই বলতো সাংবাদিকরাই এখন বিরোধী দল।
রাজনীতির
প্রগতিশীলতা আর সাংবাদিকতায় প্রগতিশীলতার অর্থ সামান্য আলাদা ভাবে চর্চিত হচ্ছিল। একজন
রাজনীতিক যখন জাতি ধর্মের উর্ধে উঠে সাম্যের কথা বলছিলেন তিনি তখন প্রগতিশীল রাজনীতিক। আর সাংবাদিক যখন এই সাম্যের দৃষ্টিকোন থেকে তথ্য
দিচ্ছিলেন তখন তিনিও প্রগতিশীল সাংবাদিক। কিন্ত সাংবাদিকের সাম্যের মধ্যে ভিন্ন রাজনীতির
সহকর্মীরাও পড়ছিলেন। কিন্ত সত্য তথ্যই দিচ্ছিলেন। এখানে প্রগতিশীলতার অর্থ দাঁড়াচ্ছিল
সব পথের লোকজন মিলে সত্য প্রকাশ। আর তাই পাশাপাশি ডেস্কে বসে হা হা হি হি হি'র মধ্যে
দিয়ে সাংবাদিকতা হচ্ছিল। সবাই সবার রাজনৈতিক চিন্তা জানতো। তাই কখনো তাদের নিজেকে লুকানোর
দরকার হয়নি।
২০০১ এ বিএনপির সরকারের সময়ও অব্যাহত ছিল এই ধারা। সত্য প্রকাশই তখন সাংবাদিকের কাছে প্রধান লক্ষ্য
ছিল৷ রাজনৈতিক বিশ্বাসের উর্ধে উঠে তখন অনেকেই সত্য প্রকাশের পক্ষে কাজ করেন। তখন থেকে
সাংবাদিকতার এই বিশাল প্রগতিশীল ধারা একটি ক্ষীণ ধারার বিরোধিতার মুখে পড়ছিল। এই ধারার
কথা আগেই বলেছি যারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। কিন্ত সেই বিরোধিতা
ধোপে টেকেনি কখনও। যাইহোক, এর মধ্যে চলে আসে
ওয়ান ইলেভেন এবং ২০০৮ এর নির্বাচন। অনেক কিছু
পরিস্কার হয়। শেখ হাসিনা গণমাধ্যমে বিনিয়োগ অবাধ করে দেন। পিলপিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছেলে মেয়েরা সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার হিসাবে গড়তে শুরু করে।
তখন সাংবাদিকতায়
আসার যোগ্যতা ছিল ভালো লিখতে পারা ভালো বলতে পারা। রাজনৈতিক বিশ্বাস অবিশ্বাসের বিষয়গুলো
তখন খুবই গৌন ছিল। আমার দৃষ্টিতে সাংবাদিকতা তখন আরও প্রগতির দিকে গিয়েছিল। কিন্তু
যোগ্যতার অভাবে কিছু লোক এই চর্চায় বাইরে থেকে যায়৷ এই সময় যোগ্যতা নিয়েই কিছু ছেলে
মেয়ে সাংবাদিকতায় আসে পারিবারিকভাবেই যাদের প্রগতিশীলতার পক্ষে থাকার কথা নয়। কিন্তু
তারাও মিলে যায় প্রগতিশীর গণমাধ্যমের স্রোতে। আর যোগ্যতার অভাবে যারা এই স্রোতে মিশতে
পারলো না, তারা কখনো ফকিরেরপুল কখনও আরামবাগ কখনও প্রেসক্লাব চত্বরে বলতে থাকলো দলীয়
লোক না হলে আজকাল সাংবাদিকতা করা যাচ্ছে না।
এক পর্যায়ে
এই অযোগ্যরাই বিষ ছড়াতে শুরু করলো কর্মরত সাংবাদিকদের নামে। এদের সঙ্গে যোগ দিল সেই
অপ্রগতিশীল ক্ষীণ ধারা। যারা এই দেশে মৌলবাদ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে কখনও গোপনে কখনও প্রকাশ্যে।
বলে রাখা ভালো এই মৌলবাদী ধারা গণমাধ্যম কর্মীদের অস্থির রাখবে এটা আরও পুরোনো পরিকল্পনা।
কেন সেই পরিকল্পনার দরকার হলো, সূত্র কোথায় সে ভিন্ন আলোচনা। কারণ এখন এসব কেনর জবাব
দিতে গেলে অনেকগুলো কেন বের হবে। সেসব কেনর
জবাব এক যায়গায় করলে হয়তো অনেক সত্য বের হবে৷ তখন হয়তো এই লেখা থেকে সাংবাদিকদের দু্র্দশার গল্পটা বের হয়ে যাবে। লেখাটা
ডি ফোকাস হবে।
আপরাই বরং সেসব কেনগুলো ভাবতে থাকুন আপাতত। খুব শিগগির আগামী পর্বে পুরো বিষয়টা আপনাদের সামনে পরিস্কার করে দেবো। আমি বলার চেষ্টা করবো কেন সাংবাদিকদের এত ক্ষোভ এই উপদেষ্টা গোষ্ঠীর। বলবো এই বানানো ক্ষোভে কার লাভ কার ক্ষতি। প্লিজ পাঠক আপনারাও ভাবুন। তারপর আপনার ভাবনার সঙ্গে মিলে গেলে অথবা যুক্ত হলে দারুণ মজা পাবেন। পাশাপাশি ভাবতে পারবেন বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্যে কিছু করা যায় কী না। চলবে...
/এসবি