আবুল বাশার, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৬:২২
ছবি: সংগৃহীত
শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাজধানীসহ দেশের
অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালগুলোর আউটডোর বা বহির্বিভাগ বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছে এখানে
চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। এ ছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ছুটির দিনেও (যেমন- বিজয় দিবস,
স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, ঈদ কিংবা পূজা) একইভাবে হাসপাতালের বহির্বিভাগ বন্ধ
থাকে। ছুটির দিনে সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি বিভাগ খোলা থাকলেও বহির্বিভাগে চিকিৎসক
না থাকায় ছোট দুর্ঘটনা, জ্বর, মাথা ও পেটে ব্যথা এবং সর্দি-কাশির মতো অসুখে ভুক্তভোগী
রোগীদের চিকিৎসার জন্য পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়।
শুক্রবার
রাজধানীর বেশ কিছু সরকারি হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির এই চিত্র
দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে
চিকিৎসকরাও শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি পেয়ে থাকেন। কিন্তু যে পেশার সঙ্গে মানুষের জীবন-মৃত্যু
জড়িত, সেখানে ছুটির দিনে রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা উচিত। এতে
সাধারণ রোগীরা উপকারভোগী হবেন।
রাজধানীর রায়েরবাজার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা নিতে আসা শহিদুল ইসলাম বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোরকে
জানান, প্রচণ্ড বুক ব্যথা অনুভব করাই তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আসেন।
বহির্বিভাগের ডাক্তার দেখানোর ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু শুক্রবার তা বন্ধ থাকায় জরুরি
বিভাগের টিকিট কেটে ডাক্তার দেখিয়েছেন।
গ্যাসের সমস্যা জানিয়ে একটি ইঞ্জেকশন ও কিছু
মেডিসিন দিয়েছেন ডাক্তাররা। তবে চাহিদা মতো চিকিৎসা না পেয়ে বাসায় চলে যাচ্ছেন বলে
জানান শহিদুল ইসলাম।
মানিকগঞ্জ থেকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে
(পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা নিতে আসা মো. আসাদুজ্জামান বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোরকে জানান,
সড়ক দূর্ঘটনায় তিনি মাথায়, পায়ে, হাতে ও বুকে
আঘাত পেয়েছেন। তিনদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ওই তিনদিন চিকিৎসকরা পরিদর্শনে এসেছেন।
তবে আজকে কোনো চিকিৎসক পরিদর্শনে আসেননি। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি জানতে
পারেন শুক্রবার কোনো চিকিৎসক ভিজিটে আসেন না।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের
মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া আক্কাস আলী নামের এক রোগী বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোরকে জানান,
তিনি গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরে হাসপাতালে
ভর্তি হয়েছেন। ভর্তির পর এখনো কোন চিকিৎসকদের পরিদর্শনে আসেননি। আগে থেকে ভর্তি রোগীর
স্বজনদের কাছে থেকে তিনি জেনেছেন শুক্রবারে চিকিৎসক ভিজিটে আসেন না।
রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, চিকিৎসক না থাকার
কারণে হাসপাতালে এসেও তারা কোনো সেবা পাচ্ছেন না। প্রতি ছুটির দিনেই তাদের এ ধরনের
সমস্যায় পড়তে হয়। অনেকে জটিল সমস্যা নিয়ে আসলেও চিকিৎসক না থাকার কারণে তাদের সেবা
না নিয়েই ফিরতে হচ্ছে। ফলে অনেক রোগীকে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এছাড়া
যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল তারা সময় মত চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে রোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ
করছে।
এদিকে বর্হিবিভাগ বন্ধ থাকায় সাপ্তাহিক ছুটির
দিন শুক্রবারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ লক্ষ্য
করা গেছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান,
বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জরুরি বিভাগের টিকেট কেটেছেন ৬৩৮ জন। এর মধ্যে আনুমানিক দুইশ
এর কাছাকাছি রোগীকে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের পর ছেড়ে দেওয়া
হয়েছে। ছুটির দিন হওয়ায় হাসপাতালের বহির্বিভাগ বন্ধ, তাই জরুরি বিভাগেই সব রোগীরা চিকিৎসা
সেবা নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন জরুরি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কয়েকজন
কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ছুটির দিনে বহির্বিভাগে চিকিৎসক বসেন না।
এ জন্য রোগীদের, বিশেষ করে দরিদ্র রোগী, যাদের বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার
সামর্থ্য নেই, তাদের সমস্যায় পড়তে হয়।
পঙ্গু হাসপাতালেও এমন চিত্র দেখা গেছে। এ হাসপাতালের
জরুরি বিভাগ থেকে জানানো হয়, প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন রোগী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে
আসেন। তবে শুক্রবার অন্যান্য দিনের থেকে বেশি রোগী জরুরি বিভাগে আসে। আর রোগীর অনুপাতে
চিকিৎসক কম হওয়ায় সবাইকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ,
সকালবেলা নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে চিকিৎসকের দেখা মেলে। সকালে বিভিন্ন কক্ষের সামনে
দীর্ঘ লাইন থাকলেও চিকিৎসক আসতে দেরি করায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় এসব রোগীদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগের
কয়েকজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সপ্তাহের অন্যান্য দিন একজন সিনিয়র
চিকিৎসকের নেতৃত্বে একাধিক চিকিৎসক ভিজিটে আসলেও শুক্রবার তা হয় না। এইদিন ওয়ার্ডে
চিকিৎসক থাকলেও তারা ওয়ার্ড ভিজিটে আসেন না। প্রয়োজনে রোগীরা চিকিৎসকদের নির্ধারিত
কক্ষে গিয়ে কথা বলে আসেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ও ইনফেকশন
বিভাগের রেজিস্টার ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী বলেন, শুক্রবার কিংবা সরকারি ছুটির
দিনগুলোতে হাসপাতালে গেলে আপনি চিকিৎসা পাবেন। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে চিকিৎসক কম থাকলেও
চিকিৎসা পাওয়া যায়। আর কোনো জরুরি অস্ত্রোপচার যদি দরকার হয়, সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসক হাজির হন হাসপাতালে।
ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী আরও বলেন, অনেক চিকিৎসক
সরকারি ছুটির দিনে নিজেদের গ্রাম কিংবা এলাকায় গিয়ে চিকিৎসাসেবা দেন। আবার অনেকে নিজেকে
আর পরিবারকে সময় দেন। তবে ছুটির দিনে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালেও রোগী দেখেন চিকিৎসকরা
বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক
আহমেদুল কবীর বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, কার্যদিবসের দিনগুলোতে চিকিৎসকেরা অনেক
ব্যস্ত সময় কাটান। তাই সরকারি ছুটির দিনে একটু ছুটির আমেজে থাকেন। তবে জরুরি প্রয়োজনে
অনেক সময় হাসপাতালেও যেতে হয়। সাধারণ মানুষ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ছুটির দিনগুলোতে
অবশ্যই সেবা পেয়ে থাকে। তবে ছুটির দিনে সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার
অভিযোগও কম আসে আসে না। আবার সামান্য অসুস্থতার কারণে ওই সময় কেউ সরকারি হাসপাতালে
যেতে পারেন না। কারণ ছুটির দিনে সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ বন্ধ থাকে। তবে জরুরী
বিভাগ চালু থাকে।
স্বাস্থ্য
অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমেদ বেঙ্গলনিউজ
টোয়েন্টিফোরকে বলেন, সাধারণ সময়গুলোতে একটি সরকারি হাসপাতালে যেখানে ছয় জন দায়িত্ব
পালন করেন, ছুটির দিনে যদি তিনজন করে চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করেন তবে কোনো সমস্যা হওয়ার
কথা না। পরে বাই রোটেশনে শুক্রবারের বা ছুটির দিনের পাওনা ছুটি তারা শনিবার বা অন্যদিন
ভোগ করতে পারেন।
তিনি মনে করেন, সদিচ্ছা থাকলেই এটি সম্ভব। এ
জন্য চিকিৎসকদের মধ্যে রোগীদের সেবা দেওয়ার মনোভাব থাকতে হবে। আর তাদের কাজে লাগাতে
কাজ করতে হবে প্রশাসনকেও। সেই সঙ্গে সরকারকে এই সমস্যা নিরসনে অতিজরুরি পদক্ষেপ নেয়ার
আহ্বান জানান এ বিশেষজ্ঞ।
এমএইচ/