নাজমুল ইসলাম

বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোর


০১ আগস্ট ২০২২ ০৮:০০



আফ্রিকায় বাংলাদেশি হত্যার কারণ ‘ঐতিহাসিক’

নাজমুল ইসলাম, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর

০১ আগস্ট ২০২২ ০৮:০০

আফ্রিকায় বাংলাদেশি হত্যার কারণ ‘ঐতিহাসিক’

ছবি : এপি

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী হত্যা দৈনন্দিন ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর সেখানে গড়ে প্রায় ১০০ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে বেঙ্গলনিউজ। অনুসন্ধানে নানা কারণ উঠে এসেছে ঠিকই; কিন্তু এসব কারণের মূলে রয়েছে ‘জেনোফোবিয়া’ বা ‘অভিবাসী-বিদ্বেষ’। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতার জায়গা থেকেও অনেক অভিবাসীকে হত্যা করা হয়। কিন্তু অভিবাসী-বিদ্বেষের কারণে হত্যাকারীরা স্থানীয়দের সমর্থন পেয়ে যান। এছাড়া প্রবাসীদের হত্যা করলে শাস্তি হয় না— এমন আত্মবিশ্বাসের কারণে সেখানে হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাচ্ছে।

অভিবাসী-বিদ্বেষ

দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসী-বিদ্বেষ নতুন নয়। ঐতিহাসিকভাবেই সেখানে অভিবাসীদের প্রতি স্থানীয়দের বিদ্বেষ রয়েছে। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে মোজাম্বিক থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ দক্ষিণ আফ্রিকায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু এদেরকে স্থানীয় জনগোষ্ঠী মেনে নেয়নি। তারা এসব আশ্রয়প্রার্থীদের মূল্যায়ন করত দখলদার হিসেবে। ১৯৯৪ সালে মোজাম্বিক ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে সমঝোতা হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ‘জেনোফোবিয়া’ বা ‘অভিবাসী-বিদ্বেষ’ থেকে যায়।

১৯৯৪ সালে কৃষাঙ্গ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসী-বিদ্বেষ আরও বেড়ে যায়। এ বিষয়ে ২০০৪ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘সাউদার্ন আফ্রিকান মাইগ্রেশন প্রজেক্ট’ (এসএএমপি)। তাতে দেখা যায়, স্থানীয়দের ২১ শতাংশই দক্ষিণ আফ্রিকায় কোনো ধরনের অভিবাসী দেখতে চান না। আর ৬৪ শতাংশ মনে করেন, প্রবেশের অনুমতি দিলেও তা খুবই সীমিত হওয়া উচিৎ।

বিদ্বেষের কারণ

দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বাস, তাদের বেকারত্বের জন্য অভিবাসীরা দায়ী। তারা মনে করেন, অভিবাসীদের কারণে তারা চাকরি পাচ্ছেন না। আবার বেশির ভাগ অভিবাসী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।

২০০৪ সালে একটি গবেষণা চালায় ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ভায়োলেন্স অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ (সিএসভিআর)। এতে দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার ৮৭ শতাংশ মানুষই মনে করেন, অবৈধ অভিবাসীদের কারণেই তাদের দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা বাড়ছে

কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীর হত্যার হার বেড়েছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচ ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৬২ অভিবাসীকে হত্যা করা হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম বিবিসির হিসাব (২০১৯ সাল পর্যন্ত) বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪৫২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আর প্রতিবছর গড়ে সেখানে ৫০ থেকে ১০০ জন বাংলাদেশি হত্যার শিকার হন। দোকানে ডাকতি, অপহরণ, কৃষ্ণাঙ্গ বা অন্যদের হাতে খুন, ছিনতাইসহ নানা কারণে বাংলাদেশিরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চলতি বছর ২৩ জুলাই পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় ৯ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। তার আগের বছর ২০২১ সালে হত্যা করা হয় ৪৮ বাংলাদেশিকে।

গত ২৩ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রাকফান শহরে একটি দোকানের ভেতরে ঢুকে শুভ ও আরিফ নামের দুই বাংলাদেশিকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীরা। এর আগে ১৩ মে সন্ত্রাসীদের গুলিতে সালাউদ্দিন রায়হান (৩৫) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হন। ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ আফিকায় সন্ত্রাসীদের হামলায় মৃত্যু হয় আরও পাঁচ বাংলাদেশির।

বিবিসি বাংলার ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশি হাইকমিশন বরাত দিয়ে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত ও নারীঘটিত শত্রুতার কারণ চিহ্নিত করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মো. রেজাউল করিম খান জানান, বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন দোকানপাটে হামলা এবং লুটতরাজ প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে বৈধ কিংবা অবৈধভাবে যারা আসেন, তারা এখানে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেন। বিশেষ করে মুদি বা গ্রোসারি দোকান। তখন দেখা যায়, বাংলাদেশি আরেকজন অভিবাসীর সঙ্গেই হয়ত তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর পরিণতিতে অনেক খুনখারাপি দেখা যায়।’

রেজাউল করিম বলেন, ‘এছাড়া কাগজপত্র বিশেষ চেক করা হয় না বলে অনেকে চলে যায় গ্রামের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় তারা স্থানীয়দের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এ থেকে দোকানে লুট, সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটে থাকে।’

বেসরকারি হিসাবে ও দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত বাংলাদেশি কমিউনিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন শহরে প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। এদের বেশিরভাগ কেপটাউন, জোহানসবার্গ এবং ব্লুমফন্টেইনে থাকেন। মূল শহরের আশপাশে এবং গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে কাজ করেন অনেকে।

এসএ/এসএল/কেএ