শায়লা বিথী, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
২৬ এপ্রিল ২০২২ ০৫:৩৯
নেপালের
নামচে বাজারকে বলা হয় শেরপাদের শহর। এর অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৪৪০ মিটার
উপরে। এভারেস্টের প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত শহরটি পড়েছে উত্তর-পূর্ব নেপালের সাগরমাথা
অঞ্চলের সোলুখুম্বু জেলায়। এভারেস্টের আশেপাশের পর্বত অভিযানের জন্য নামচে দিন দিন
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যেখানে স্থায়ী বসতি দেড় হাজার মানুষের। পর্যটন মৌসুমে আরো ৫০০
মানুষ আসে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে। বছরের এপ্রিল-মে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এখানে
পর্যটন মৌসুম।
নামচের
বাসিন্দাদের জীবিকা মূলত পর্যটন ব্যবসা কেন্দ্রিক। কৃষিকাজের পাশাপাশি পরিবারের নারীরা
তাদের বাড়ির একটি ঘরকে লজ বা হোমস্টে হিসেবে পরিচালনা করে। আর পুরুষরা কাজ করে শেরপা,
পোর্টার বা ট্যুর অপারেটর হিসেবে। তবে ইদানীংকালে নারীদেরও গাইড, শেরপা বা ট্যুর অপারেটর
হিসেবেও কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।
অভিযাত্রীদের
এই ট্রেইলে কেনাকাটার সবশেষ সুযোগ থাকে নামচেতেই। কাঠমান্ডু থেকে প্রয়োজনীয় কোনো সরঞ্জাম
বা পোশাক আনতে ভুলে গেলেও নামচেতেও তা পাওয়া যাবে। সাধারণত নামচে বাজারকে ‘অ্যাক্লাইম্যাটাইজেশন
স্পট’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অ্যাক্লাইম্যাটাইজেশন হচ্ছে পাহাড়-পর্বতের উচ্চতায় ধীরে
ধীরে শরীরকে খাপ খাওয়ানো। অভিযাত্রীরা পাহাড়ে নির্দিষ্ট উচ্চতা পরপর একদিন বিশ্রাম
নেয়। এর ফলে ওই অঞ্চলের আবহাওয়ার সাথে শরীরকে খাপ খাওয়াতে সুবিধা হয়। পাহাড়ি উচ্চতায়
ধীরে ধীরে শরীরকে খাপ খাওয়ানোর এই প্রক্রিয়াই অ্যাক্লাইম্যাটাইজেশন।
জেনে
রাখা ভালো, নামচে বাজারে গাড়ি চেপে যাওয়ার সুযোগ নেই। লুকলা শহর থেকে দুই দিন হাঁটলেই
মেলে এ বাজার। তবে স্থানীয়দের কাছে এ পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে একদিন। পথে কয়েকটা সাসপেনশান
ব্রিজ পরে। নামচে শহরে ঢোকার একটু আগে রয়েছে চেকপোস্ট। এখানে নাম এন্ট্রি করাতে হয়
সব টুরিস্টকে। পথে বিভিন্ন জায়গায় রডোডেনড্রন গাছের দেখা মেলে। তাছাড়া সাধ্য থাকলে
হেলিকপ্টারে করেও নামচেতে যাওয়ার সুযোগ আছে। সাধারণত অভিযাত্রীরা এখানে আসার পর একদিন
বিশ্রাম নেয়।
নামচে
বাজারে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণের সব ধরনের সরঞ্জামই পাওয়া যায়। হোমস্টে ছাড়াও সেখানে
হোটেল, লজ ও রেস্তোরাঁ আছে। এছাড়াও স্কুল, ব্যাংক, এটিএম বুথ, বেকারি, ফার্মেসি, আইরিস
পাব, বিউটি পার্লার, ম্যাসাজ পার্লার, সাইবার ক্যাফে, পুল, পশ কফি শপ, বুক শপ, বিদেশি
খাবারের দোকান—
কী নেই এখানে! ইয়াক চিজ ও ইয়াক স্টেক নামচের জনপ্রিয় স্থানীয় খাবার। শহুরে সব সুযোগ-সুবিধা
মিলেলেও এখন শহরটি তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর আতিথেয়তা ধরে রেখেছে। নামচের শনিবার একটু
অন্যরকম। খুব সকাল বেলা বসে সাপ্তাহিক বাজার বা মেলা। সাধারণত তিব্বত, চীন এবং আশেপাশের
গ্রাম থেকে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এখানে নিয়ে আসে।
আমি
প্রথম নামচে বাজার যাই ২০১৫ সালের অক্টোবরে, মাউন্ট ক্যাজুরি বেসক্যাম্প ট্রেকিংয়ের
সময়। একদম ছবির মতো সবকিছু। আর যেহেতু প্রথম হিমালয় দর্শন, তাই কৌতূহল, মুগ্ধতা— দুটোই
ছিল বেশি। কাঠমান্ডু থেকে আকাশপথে লুকলায় আসি। লুকলা থেকে ফাকদিন হয়ে নামচে বাজার।
নামচের এডি ফ্রেন্ডশিপ লজে আমরা যখন পৌঁছি, তখন পুরো নামচে মেঘে ছেয়ে গেছে। আশেপাশের
কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। পথেই দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। নেপালি থালি নামে পরিচিত
সেই খাবারের প্যাকেজে ছিল—
মুরগীর ছোট ছোট পিসের ঝোল, সেদ্ধ রাই শাক, ঘন মুসুরের ডাল, ভাত
আর পাপড়। সাথে কাঁচা মরিচ। এতো খেয়েছি যে হাঁটতেই কষ্ট হচ্ছিল! এসব ট্রেইলে একটা প্রবাদ
প্রচলিত আছে ‘ডাল-ভাত পাওয়ার, টুয়েন্টি ফোর আওয়ারস’। স্থানীয়রা মজা করে এটা বলে। নেপালিদেরও
প্রধান খাদ্য আমাদের মতো ডাল-ভাত। বিদেশিদের কাছে তাই হয়তো এই বলে প্রচার চালায়।
নামচে
পৌঁছে ব্যাকপ্যাক রেখে একটু রেস্ট নিয়ে আমার গ্রাম দেখতে বেরোলাম। পুরো নামচে টুরিস্টে
গমগম করছে। কফির দোকানে হালকা মিউজিক, রেস্তোরাঁয় কাজের ব্যস্ততা, পার্লারের সামনে
ললনাদের হাসিমুখ—
সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় শহর লাগছে নামচেকে! বিকেল গড়ানোর সাথে
সাথে ঠাণ্ডাও বাড়তে লাগল। কাজেই বেশিক্ষণ বাইরে ঘোরাঘুরি করা গেলো না। আমাদের লজে ফিরে
আসত হলো। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই চারিদিকের নিরবতায় মনে হলো যেন গভীর রাত নেমে এসেছে।
৭টার মধ্যে ডিনার শেষ করে ৮টার মধ্যে ঘুমাতে গেলাম। ভাবা যায়, রাত ৮টায় ঘুমাবো! আসলে
পাহাড় এমনই। সারাদিন ট্রেকিং করে রাতে সবাই ভীষণ ক্লান্ত থাকে। চাইলেও রাত জাগা হয়
না, ভোরেই যে দ্রুত বেরিয়ে পড়তে হবে। পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল, জানালা দিয়ে তাকাতেই
যেন মনে হলো - স্বর্গে এসে গেছি। সকালের রোদ মাত্রই উঠেছে, উঁকি দিচ্ছে তুষারশুভ্র
পাহাড়। গাইড জানাল, ওইটা কোয়াংদে পর্বত।
আমাদের
সাথে গাইড হিসেবে ছিল দাকিপা শেরপা। হিমালয়ের পথে যেহেতু প্রথম হাঁটছিলাম, তাই সব কিছুতেই
ছিল অতিরিক্ত সতর্কতা। তবে ধীরে হাঁটা যাবে না, তাহলে টিম পিছিয়ে পড়তে পারে। আমি চেস্টা
করছিলাম শেরপার সাথে জোরে হাঁটার, যদিও তা ছিলো ‘বৃথা’ চেষ্টা। কেননা আর যাইহোক, শেরপার
সাথে পাহাড়ে তাল মিলিয়ে হাঁটা অসম্ভব। কথায় কথায় জানা গেল, আমাদের শেরপা দাকিপা বিখ্যাত
‘এভারেস্ট’ মুভিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন। শুনে উচ্ছ্বসিত হলাম। আধো ইংলিশ,
আধো হিন্দিতে সেই গল্প একটু-আধটু করছিলেন।
হাঁটতে
হাঁটতে খেয়াল করলাম- যখনই কোনো অভিযাত্রী আরেক অভিযাত্রীকে অতিক্রম করছে, তখন একে অপরকে ‘নমস্তে’ বলছে। ব্যাপারটা খুবই ভালো লাগল।
নতুন একটা বিষয় শিখলাম। এমন অভিবাদনে অভ্যস্ত না আমি। আসলে
পাহাড় এমনই। বিস্ময়ের সীমা নেই। এ এক অন্য জগৎ! আর পাহাড়ের ডাক একবার যার হৃদয়ে পৌঁছায়,
সে বার বার পাহাড়ের সান্নিধ্যে ছুটে যায়।