রংপুর সংবাদদাতা, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
১১ নভেম্বর ২০২২ ০৮:০৭
ছবি: রংপুর সংবাদদাতা
রংপুরের
ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি আজ বিশ্ব দরবারে শুধু স্বীকৃতই নয়, সমাদৃতও বটে। এই জেলার বহু মানুষের
ভাগ্য বদলে দিয়েছে এই শতরঞ্জি শিল্প। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ও স্থানীয় শ্রমিকদের
ডিজাইনে করা শতরঞ্জি রপ্তানি করে প্রতিবছর অর্জিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
অন্যদিকে
নান্দনিক ও অনিন্দ্যসুন্দর কারুকার্যের জন্য শতরঞ্জিকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য
হিসেবেও মর্যাদা দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)।
শতরঞ্জি
শুধু রংপুরের ঐতিহ্য নয়, এটি বাংলাদেশেরও ঐতিহ্য বহনকারী পণ্য। রংপুর শহরের উপকণ্ঠে
ঘাঘট নদীর তীরে নিসবেতগঞ্জ গ্রাম। শতরঞ্জি শিল্পের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে
জুড়ে আছে এ গ্রামের নাম। নিসবেতগঞ্জের নাম আগে ছিল পীরপুর। পীরপুর গ্রামে তখন মোট মোটা
ডোরাকাটা রং-বেরংয়ের সুতার গালিচা বা শতরঞ্জি তৈরি হতো। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রংপুর
জেলার কালেক্টর (ব্রিটিশ নাগরিক) মি. নিসবেত শতরঞ্জি দেখে মুগ্ধ হন। পরবর্তীতে তিনি শতরঞ্জির
মান উন্নয়নসহ এ শিল্পের প্রচার ও প্রসারের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেন। এমনকি এই
পণ্যের ব্যাপক বিপণনেরও ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে তিনি এ শিল্পের মান উন্নয়ন ও বিপণন
ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এসব কারণে মি. নিশবেতের নামানুসারে ওই গ্রামের
নাম রাখা হয় নিসবেতগঞ্জ।
জানা
যায়, ত্রয়োদশ শতাব্দীতেও এ এলাকায় শতরঞ্জির প্রচলন ছিল। রাজা-বাদশাহদের গৃহে এর ব্যাপক
কদর ছিল। মোঘল সম্রাট আকবরের দরবারে শতরঞ্জি ব্যবহার করা হতো বলে ইতিহাস থেকে জানা
যায়। ত্রিশ দশকের জমিদার জোতদারদের ভোজের আসন হিসেবে শতরঞ্জির ব্যবহারের কথা শোনা যায়।
সে সময়ে রাজা-বাদশাহ ও বিত্তবানদের বাড়িতে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে শতরঞ্জি ব্যবহৃত
হতো।ব্রিটিশ শাসনামলে শতরঞ্জি এত বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যে এখানকার শতরঞ্জি ভারতবর্ষের
সীমানা ছাড়িয়ে বার্মা, সিংহল, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন
দেশে রপ্তানি হতো।
এ
পণ্য উৎপাদনে কোনো ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। শুধু বাঁশ ও রশি দিয়ে মাটির ওপর
সুতার টানা প্রস্তুতের পর প্রতিটি সুতা গণনা করে হাত দিয়ে নকশা করা শতরঞ্জি বানানো হয়।
কোনো জোড়া ছাড়া যেকোনো মাপের শতরঞ্জি তৈরি করা যায়।
১৯৭৬
সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) নিসবেতগঞ্জ গ্রামে শতরঞ্জি
তৈরির একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু ব্যাপক বাজার সৃষ্টি করতে না পারায় প্রকল্পটি
ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়ে। এরপর থেকে অবহেলিত শতরঞ্জি শিল্পটি আর সরকারের দৃষ্টিতে আসেনি।
কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এ পেশার সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক বাপ-দাদার পেশাকে
আঁকড়ে ধরে রেখেছিল।
অবহেলার
শিকার হয়ে বিলুপ্ত হতে যাওয়া শিল্পটির প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। ১৯৯৪
সালে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বিনা পয়সায় আরও উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে ওই এলাকার
মানুষকে শতরঞ্জি তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর ঢাকার এক ব্যবসায়ী বিসিকের এ কেন্দ্রটি
লিজ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রংপুর শহরের কারুপণ্যের মালিক
শফিকুল আলম সেলিমের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শতরঞ্জির ব্যবহার আরও বহুমুখী হয়ে ওঠে। সেই
থেকে আর থেমে নেই শতরঞ্জি উৎপাদন। এখন নিসবেতগঞ্জের শতরঞ্জি পল্লী কারুপণ্যের বিশাল
ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। নিসবেতগঞ্জের অধিকাংশ বাড়ির আঙিনা কিংবা উঠানে অথবা টিনের
ছাউনির নিচে নিপুণ হাতে চলছে কারুকাজ খচিত শতরঞ্জি বোনার কাজ। যেখানে পূর্বে হাতির
পা, জাফরি, ইটকাঠি, নাটাই ইত্যাদি নামের নকশাসংবলিত শতরঞ্জি তৈরি হতো সেখানে এখন আরও
রং-বেরংয়ের বাহারি নকশার শতরঞ্জি উৎপাদিত হচ্ছে।
কয়েক
বছর আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মধ্য দিয়ে খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের
উদ্যোগে ইউরোপিয়ান কমিশনের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে রংপুরের শতরঞ্জির পরিচয় ঘটে। প্রতিবছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ কারুশিল্পসামগ্রী রপ্তানি হয়, তার ৫০ ভাগই শতরঞ্জি।
বিশ্বের প্রায় ৩৬টি দেশে শতরঞ্জি রপ্তানি করা হচ্ছে। এখন শতরঞ্জি রপ্তানি করে বছরে
আয় হচ্ছে প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।
এ
শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা,
কারিগরি জ্ঞানের অভাব ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা শতরঞ্জি কারখানা তৈরির ক্ষেত্রে
নানা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। সরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে শতরঞ্জি শিল্প দেশীয় ঐতিহ্য
রক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক আয় এবং কর্মসংস্থানে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
জেবি/