সজীব আহমেদ

বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোর


২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১০:৪৫



দেশে মসলার ঘাটতি ১২ লাখ টন

সজীব আহমেদ, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর

২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১০:৪৫

দেশে মসলার ঘাটতি ১২ লাখ টন

ছবি: সংগৃহীত

দেশে বর্তমানে ৫৯ লাখ টন মসলার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন হচ্ছে ৪৭ লাখ টন। বাকি ১২ লাখ টন আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। যাতে ব্যয় হচ্ছে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানায়, দেশে মসলা জাতীয় ফসলের চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা পেঁয়াজের। দেশে এর চাহিদা প্রায় ৩৭ লাখ টন। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৩৬ লাখ টন। এর মধ্যে পেঁয়াজের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হয়। এছাড়া রান্নার সময় পেঁয়াজের কিছু অপচয় হয়। সবমিলিয়ে অপচয় বাদ দিলে দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি আড়াই থেকে তিন লাখ টন। এদিকে দেশে সবচেয়ে বেশি আমদানি করতে হয় আদা। যার চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। উৎপাদন হয় ২ লাখ টন। প্রায় অর্ধেকই আমদানি করতে হয়।

দেশে ব্যবহৃত প্রায় ৫০ ধরনের মসলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আদা, হলুদ, মরিচ, রসুন, পেঁয়াজ, কালোজিরা, গোলমরিচ, আলুবোখারা, বিলাতি ধনিয়া, ধনিয়া, সাদা এলাচ, কালো এলাচ, দারচিনি, জাফরান, তেজপাতা, জিরা, মেথি, শাহি জিরা, পার্সলে, কাজুবাদাম, পানবিলাস, দইং, কারিপাতা, পাতা পেঁয়াজ, লেমনগ্রাস, কিশমিশ, অলস্পাইস, শটি, আম আদা, চৈঝাল, একানি, মৌরি, পেস্তাবাদাম, জায়ফল, জয়ত্রি, লবঙ্গ, ডালফিরিঙ্গি ও রাঁধুনি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৫৯ লাখ টন মসলাজাতীয় ফসলের চাহিদা রয়েছে। উৎপাদন হয় ৪৬ লাখ টন। ঘাটতি রয়েছে ১৩ টন। ঘাটতির এই মসলা আমদানি করতে হয় ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। এতে খরচ হয় তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা।

ডিএই তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৬ লাখ ৪ হাজার ১১৪ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। একইভাবে এ অর্থবছরে রসুন ৭ লাখ ৭০ হাজার ২০০ টন, ধনিয়া ৬৪ হাজার ২০০ টন, মরিচ ২ লাখ ২৩ হাজার ২০৩ টন, কালোজিরা ১২ হাজার ৫৮১ টন উৎপাদন হয়েছে।

আর ২০২১-২২ অর্থবছরে আদা ২ লাখ ৭ হাজার ১০০ টন ও হলুদ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ১০০ টন। সবমিলিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে এই সাতটি মসলার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫০ লাখ ৬০ হাজার ৪৯৮ টন। আদা ও হলুদ ছাড়া এই অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৪৬ লাখ ৭৪ হাজার ২৯৮ টন।

ডিএই চলতি অর্থবছরে ৩৬ লাখ ৩০ হাজার ১৬৮ টন পেঁয়াজ, ৭ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৮ টন রসুন, ৬৪ হাজার ৮৫২ টন ধনিয়া, ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৭৪ টন মরিচ, ১২ হাজার ৬৩১ টন কালোজিরা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ৮০০ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ২২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫৪ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৪৪৮ টন রসুন উৎপাদন হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৫ লাখ ১ হাজার ৬১১ টনে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে হলুদ উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার ১৫৮ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে হয় ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৩৭ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আদা উৎপাদন হয় ৮৪ হাজার ৮৮৭ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে হয় ৮১ হাজার ৭১৫ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ধনে বীজ হয় ২১ হাজার ৩৪৬ টন। ২০২০-২১ বছরে তা হয় ২১ হাজার ৫১৮ টন। একইভাবে ২০১৯-২০ বছরে ধনে পাতা হয় ৫ হাজার ৬১৬ টন; ২০২০-২১ বছরে তা বেড়ে হয় ৬ হাজার ৩০৯ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কালোজিরা হয় ১ হাজার ৫ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে হয় ১ হাজার ৬৮ টন। ক্যাপসিকাম ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ১৭৬ টন এবং মেথি হয় ১৮৫ টন। পুদিনা হয় ৩ দশমিক ৯৩ টন।

মসলাজাতীয় ফসলের গবষেণা জোরদারকরণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘দেশে মসলার চাহিদা প্রায় ৫৯ লাখ টন। আর দেশে মসলার উৎপাদন হয় ৪৬ লাখ টন। প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ লাখ টনের মতো মসলার ঘাটতি আছে। এ জন্য তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি করতে হয়।’

শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার আরও বলেন, ‘দেশে ৫০ ধরনের মসলার ব্যবহার হয়। এর মধ্যে মসলার উৎপাদন হয় ৩৫ ধরনের। আর আমরা (বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র) ৪৪ ধরনের মসলা গবেষণা করি।’

শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, গতবার তিন লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি ছিল। বর্তমানে দেড়-দুই লাখ টনে নেমে এসেছে। রসুনের ঘাটতি দেশে খুব কম। তবে বেশি ঘাটতি হচ্ছে আদাতে। প্রায় অর্ধেকই আমদানি করতে হয়।

মসলার উৎপাদন বাড়ানোর প্রসঙ্গে শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, ঘাটতি মেটাতে আমরা অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। প্রথমত, একক জমিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করা। আর এজন্য উন্নত জাত ব্যবহারের পাশাপাশি উন্নত চাষাবাদ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার। সেই সঙ্গে সঠিক সময়ে বপন, সঠিক মাত্রার সার পানির ব্যবস্থাপনা ও যত্ন নেওয়া হলে মসলা জাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়ানো যাবে। এছাড়া উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্যবহার। যা ব্যবহার করে আমাদের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন বাড়ানো যাবে। দ্বিতীয়ত, আন্তঃফসল হিসেবে মসলার উৎপাদন বাড়ানো যাবে। তৃতীয়, পতিত এলাকায় মসলা চাষ। যা করে উৎপাদন বাড়ানো যাবে। আর রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে করা যাতে ফসল নষ্ট কম হয়। আমাদের সংগ্রহত্তক সময়ে মসলা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়। যেখানে যদি ৫ শতাংশও নষ্ট কমানো যায় তাহলে ১ লাখ ৫০ হাজার টন মসলা বেশি পাওয়া যাবে।

আদার ঘাটতি কমানো সম্পর্কে শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, আদা বর্ষকালে চাষ করতে হয়। উঁচু জমি ছাড়া চাষ করা যায় না। পাশাপাশি আদা চাষের সময় বৃষ্টি হলে ক্ষতি হয়। এ ক্ষেত্রে ছাদ বাগানের মাধ্যমে চাষ করা যায়। এ ছাড়া আমাদের নতুন একটি প্রযুক্তি এসেছে। ২০১৭ সাল থেকে এ প্রযুক্তিতে কাজ করছি। সেটা হলো বস্তায় আদা চাষ ও নারিকেলের ছোবলার মধ্যে আদা চাষ পদ্ধতি।

/এআর