নিজস্ব প্রতিবেদক, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
১৮ জানুয়ারি ২০২৩ ০৩:৩৭
ছবি: বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের
অন্যতম জেলা দিনাজপুরের কাহারোল থানায় ঢেপা নদীর তীরে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে
দাঁড়িয়ে আছে কান্তজির মন্দির। এটিকে কান্তজীউ বা কান্তজীর আবার কান্তনগর মন্দির
নামেও ডাকা হয়। এছাড়াও নবরত্ন মন্দির নামেও এটা অনেকের কাছে পরিচিত। কারণ তিনতলা
বিশিষ্ট মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিল। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে বহু পর্যটক
ছুটে আসে এ মন্দিরটি দর্শনে । হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক জগত সম্পর্কে মন্দিরটি ধারণা
প্রদান করে।
মন্দিরের শিলালিপি থেকে
জানা যায়, দিনাজপুরের মহারাজা ও জমিদার প্রাণনাথ রায় এই মন্দিরের কাজ শুরু করেন।
১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রাণনাথ রায়ের মৃত্যুর পর তার পোষ্যপুত্র ১৭৫২ সালে মন্দিরটি
নির্মাণ কাজ শেষ করেন। তবে জনশ্রুতি আছে, কৃষ্ণের বিগ্রহের অধিষ্ঠানের জন্য এ
মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল।
মন্দিরটি একটি আয়তাকার
প্রাঙ্গণের উপর স্থাপিত। এটির চারিদিকে রয়েছে পূজারীদের বসার স্থান। প্রত্নতত্ত্ব
অধিদপ্তরের মতে, এ মন্দিরের উচ্চতা ৫০ ফুট। জমকালো পিরামিড আকৃতির মন্দিরটি তিনটি
ধাপে উঠে গিয়েছে এবং তিন ধাপের কোণগুলোর উপরে মোট নয়টি অলংকৃত শিখর বা রত্ন
রয়েছে; যা দেখে মনে হতে পারে একটি উঁচু ভিত্তির উপর প্রকাণ্ড একটি রথ দাঁড়িয়ে
আছে।
কান্তজির মন্দিরের
স্থাপত্য রীতি, গঠন বিন্যাস, শিল্প ও কারুকার্যসহ আরও অনেক কিছুর সংমিশ্রণে এটি
হয়ে উঠেছে অত্যন্ত নয়াভিরাম। মন্দিরের দেওয়ালের প্রতিটি ইঞ্চিতে তিনটি পৌরাণিক
কাহিনীর অনুসরণে মনুষ্য মূর্তি, প্রতিকৃতি, প্রাকৃতিক বিষয়াবলী ফুটিয়ে তোলা
হয়েছে। মহাভারত রামায়ণের নানা বিষয়ের উপস্থিতি এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এমন অনেক
দৃশ্য ও বিষয় আছে, যা গ্রামবাংলা জীবন-বৈচিত্র্যকে মনে করিয়ে দেয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর
বলছে, কান্তজির মন্দিরে সঙ্গে উড়িষ্যা ও দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের মিল থাকলেও এখানে
কামদ দৃশ্যাবলির চিত্র অঙ্কন করা হয়নি। যেমনটি দেখা যায় উড়িষ্যা ও দক্ষিণ ভারতের
মন্দিরে। আদি ঐতিহাসিক পাহাড়পুর, ভাসুবিহার, সীতাকোট বৌদ্ধ মন্দিরগুলো লতাপাতা ও
মূর্তি দিয়ে বড় বড় পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সজ্জিত, যা অনেকটা সেকেলে ধরনের গঠন।
কিন্তু কান্তজির মন্দিরের গঠনে আধুনিকতার ছোঁয়া দেখা যায়। এখানে শিল্পীদের উচ্চতর
দক্ষতার প্রকাশ পেয়েছে। তবে ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মন্দিরটি বড় ধরনের ক্ষতির
সম্মুখীন হয়। এতে মন্দিরের উপরের রত্নসমূহ ভেঙ্গে পড়ে।
দৈনন্দিন পূজা-অর্চনার
পাশাপাশি মন্দিরকে ঘিরে প্রতিবছর নভেম্বরে এক মাস ব্যাপী মেলা ও উৎসব আয়োজন করা
হয়। এ মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাম উৎসব ও মাসব্যাপী এ মেলার আয়োজন চলে আসছে।
হিন্দু ধর্মালম্বীর মানুষ ছাড়াও দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরা এই মেলায় ও মন্দির
দেখতে আসে।
আচার–অনুষ্ঠান, অলংকার ও বিভিন্ন দৃশ্যপটের সংমিশ্রণে কান্তজীর মন্দির একদিকে যেমন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তেমনি তৈরি হয়েছে একটি দর্শনীয় পর্যটন স্পটেও।