অরুণাভ বিলে

বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোর


২৩ অক্টোবর ২০২৪ ১০:১৬



ছোটগল্প
“বাড়ি”

অরুণাভ বিলে, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর

২৩ অক্টোবর ২০২৪ ১০:১৬

“বাড়ি”

ছবিঃ অরুণাভ বিলে

শহরতলীর এক রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সদ্য বিবাহিত এক যুগল। ছেলেটি মেয়েটার কোমর জড়িয়ে এবং মেয়েটি ছেলেটির কাঁধে মাথা রেখে গল্প করতে করতে হাঁটছে। ক্লান্ত চাঁদ টুকরো টুকরো ভাসমান মেঘের আড়াল থেকে ক্ষণিক উঁকি দিয়ে আবার হারিয়ে যাচ্ছে। মেঘের জলে চাঁদের ডুবসাঁতার দেখে মনে হচ্ছিল সুন্দরী ভারিয়ার রূপ দেখে ঈর্ষায় বারবার ডুবে যাচ্ছে কুমারী বুড়ি চাঁদ। লিলাক এবং বন্য চেরির সুঘ্রাণে কল্লোলিত বাতাস, রেললাইনের ওপার থেকে ভেসে আসে নিঃসঙ্গ এক কর্নক্রেক পাখির চিৎকার।

“সাশা দেখো, কতো সুন্দর লাগছে সবকিছু! এতো সুন্দর আর মায়াবী আলোছায়া!” “সব স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। দেখো, পুলিশটি কি মিষ্টি এবং সুন্দর করে হেসে আমাদের দেখছে!” 

নীরবে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে টেলিগ্রাফের পোস্টগুলি, দৃষ্টির ক্যানভাস জুড়ে তারা প্রচার করছে  মানবতা ও সভ্যতার বাণী।

 বাতাসে ট্রেনের ছুটে আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে, সুন্দর না?

হ্যাঁ... কিন্তু তোমার হাত দুটো এতো গরম হয়ে আছে!!! তোমাকে বেশ উত্তেজিত লাগছে ভারিয়া...

আজ আমাদের রাতের জন্য কি আয়োজন করেছো?" "মুরগির মাংস এবং সালাদ...

পুরোটা? একটি মুরগি দু'জনের জন্য অনেক বেশি...  “তারপর স্যামন এবং সার্ডিন মাাছও আছে।"

চাঁদ যেন প্রদীপের নিভু সলতের মতো মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছে। মানুষের সুখ তাকে তার নিজের একাকীত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। তন্দ্রাচ্ছন্ন চাঁদ নতজানু হয়ে পাহাড় এবং উপতক্যার ওপারে একাকী হেলে যায় আদিম শূন্য়তায়। 

"ট্রেন আসছে!" ভারিয়া বললো, "কি আনন্দ!"

দেখো! মনে হচ্ছে এক প্রাগৈতিহাসিক অজগর ছুটে আসছে।

স্টেশনমাস্টার বেরিয়ে এলেন প্ল্যাটফর্মে। সিগন্যাল বাতিগুলো জ্বলছে।

"চলো ট্রেন দেখি তারপর বাড়ি যাই," সাশা বলল। "আমরা একসাথে কি চমৎকার সময় কাটাচ্ছি, ভারিয়া, এতো দারুণ লাগছে! কেউ বিশ্বাস করবে না, সত্যি!"

প্ল্যাটফর্মে নিঃশব্দে থমকে গেল ট্রেন। জানালার ঝাপসা আলোতে কাকে দেখা যাচ্ছে বলতো?

"দেখো, দেখো!" ট্রেন থেকে  কারা নামছে!! 

ভারিয়া এবং সাশা আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছে!

 ভারিয়া… ভারিয়া…

দেখো! ওরা আসছে…

দুটি ছোট মেয়ে ট্রেন থেকে নেমে ভারিয়াকে আলিঙ্গন করলো।

ওদের পিছনে একজন মধ্যবয়সী মহিলা এবং ধূসর গোঁফওয়ালা লিকলিকে লম্বা ভদ্রলোক; তাদের পিছনে কাঁধে ব্যাগ  নিয়ে দুজন স্কুলপড়ুয়া ছেলে, আর তাদের গৃহশিক্ষিকা এবং দিদা।

"এই যে আমরা চলে এসেছি!" ভদ্রলোক ফিসফিস করে সাশার হাত চেপে ধরলেন। "আমাদের জন্য অপেক্ষা করে অধৈর্য হয়ে গেছো! আমার মনে হচ্ছে, এত দেরী হাবার জন্য তুমি তোমার বৃদ্ধ মামার উপর রেগে আছো! এই যে কোল্যা, কোস্ট্যা, নিনা, ফিফা ... বাচ্চারা! তোমার ভাই সাশা, ওকেও আলিঙ্গন করে আদর করো।

আমরা সবাই এখানে, আমাদের পুরো পরিবার, মাত্র তিন বা চার দিনের জন্য... আমি আশা করি আমরা তোমাদের জন্য খুব বেশি বোঝা হব না? আমাদের তাড়িয়ে দেবে না তো!"

মামা এবং তার পরিবার দেখে, তরুণ দম্পতি সত্যিই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। মামা যখন কথা বলছিলেন এবং তাদের স্নেহ করছিলেন, তখন সাশা ভাবছিল: সে এবং ভারিয়া, তাদের তিনটি ছোট ঘর!

বালিশ এবং বিছানা তারা অতিথিদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে; স্যামন, সার্ডিনস, মুরগি সব এক মুহূর্তে গ্রাস; মামাতো ভাইবোনেরা তাদের ছোট্ট বাগানে ফুল ছিঁড়ে, কলি ছিটিয়ে, কোলাহলে মুখরিত করেছে; মামি তার অসুস্থতা এবং তার বাবা ব্যারন ভন ফিনটিচের বিষয়ে ক্রমাগত কথা বলেই যাচ্ছেন।

এবং সাশা তার স্ত্রী ভারিয়ার দিকে তাকিয়ে বিরক্তির স্বরে ফিসফিস করে বলল: "ওরা তোমাকে দেখতে এসেছে! ... এরা অভিশাপ!"

"না, এটা তোমার," রাগান্বিত হয়ে উত্তর দিল ভারিয়া। "ওরা তোমার আত্মীয়! আমার নয়!"

এরপর ভারিয়া অতিথিদের দিকে ফিরে, এক চিলতে নরম রোদের মত মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো: "আমাদের বাড়িতে স্বাগতম!"

ক্লান্ত বুড়ি চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে হেসে উঠল আবার। ভারিয়া বেশ আনন্দিত! যেন সাশার সাথে তার কিছুই হয় নি! সাশা তার রাগ মুখ লুকানোর জন্য মাথা ঘুরিয়ে নিলো। প্রচণ্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের ব্যক্তিত্ব বজার রাখার জন্য বললো: "আপনাদের আগমন আনন্দের! আমাদের বাড়িতে স্বাগতম!

মূল গল্পঃ “A Country Cottage” By Anton Chekov

অনুবাদঃ অরুণাভ বিলে

লেখক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা

ইউনিভারর্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনা